খোলা বার্তা ডেস্ক:
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভায় প্রশাসক, নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী—গুরুত্বপূর্ণ তিন পদেই স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম। নাগরিক সনদ ও চারিত্রিক সনদ পেতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন পৌরবাসী। নিয়মিত হচ্ছে না পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। পৌর কার্যালয় চত্বরে পড়ে আছে পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত গাড়ি। এমনকি অনেক সময় অফিস কক্ষেও তালা ঝুলতে দেখা যায়।পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সেবার জন্য পৌরসভায় গিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে না পেয়ে তাদের ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে পৌরসভার উন্নয়ন ও নিয়মিত কার্যক্রম।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের কার্যক্রম বাতিল করা হয়। এরপর রায়গঞ্জ পৌরসভায় প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা ভূমি অফিসের একজন কর্মকর্তাকে। পরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে জটিলতা তৈরি হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে তিনিও নিয়মিত পৌরসভায় বসতে পারছেন না। একইভাবে পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও অন্য পৌরসভায় কর্মরত এবং রায়গঞ্জ পৌরসভায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। নাগরিক সনদ, চারিত্রিক সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে এসে অনেকেই দিনের পর দিন পৌরসভায় ঘুরছেন বলে অভিযোগ করেছেন।পৌর এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের। অথচ পৌর কার্যালয় চত্বরে পড়ে আছে পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত একাধিক গাড়ি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব যানবাহনও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।রায়গঞ্জ উপজেলা যুবদলের নেতা আশিকুর রহমান প্লাবন বলেন, ‘পৌরসভা নাগরিকদের সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রায়গঞ্জ পৌরসভা থেকে বর্তমানে পৌরবাসী সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। এখানে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই, মেয়র নেই, কাউন্সিলরও নেই। সেবা নিতে এসে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে মানুষকে।’তিনি আরও বলেন, ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত প্রকৌশলী না থাকায় উন্নয়নকাজ ঠিকমতো তদারক করা যাচ্ছে না। আমরা চাই, পৌরসভায় একজন স্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হোক, যিনি নিয়মিত পৌরসভায় বসে নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করবেন।’রায়গঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী সীমান্ত তালুকদার বলেন, ‘চারিত্রিক সনদের জন্য কয়েক দিন ধরে পৌরসভায় ঘুরছি। কিন্তু সনদ পাচ্ছি না। স্বাক্ষর না হওয়ায় তারা আমাকে সনদ দিতে পারছে না। শুধু আমি নই, পৌরসভার অনেক মানুষই প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য এভাবে ঘুরছেন।’তিনি বলেন, ‘পৌরবাসী হিসেবে পৌরসভা থেকে যে সেবা পাওয়ার কথা, তা পাচ্ছি না। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও হচ্ছে না। আমরা পৌরকর দিই, কিন্তু সেই অনুযায়ী সেবা পাচ্ছি না।’আরেক বাসিন্দা হৃদয় আহমেদ সিফাত বলেন, ‘রায়গঞ্জ পৌরসভা জনবল সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। নির্বাহী কর্মকর্তা নেই, প্রকৌশলী নেই। প্রশাসকও নিয়মিত অফিস করেন না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা না থাকায় পৌরসভার কার্যক্রম অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে চলছে।’তিনি আরও বলেন, ‘ময়লার গাড়িগুলো পৌরসভায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। অথচ মাঠপর্যায়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে। এই অবস্থা থেকে পৌরবাসীকে দ্রুত রক্ষা করা দরকার।’নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পৌরসভায় ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা না থাকায় অন্যান্য কর্মচারী ও কর্মকর্তারা নিয়মিত অফিস করছেন কি না, কাজ করছেন কি না—এসব দেখার কেউ নেই। অথচ ব্যয় ঠিকই হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মাঠে না থাকলেও বেতন হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কাজও চলছে যেনতেনভাবে।’তিনি বলেন, ‘গত দুই বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখলেই রায়গঞ্জ পৌরসভার প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।’রায়গঞ্জ পৌরসভার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় রায়গঞ্জ পৌরসভার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁকে একটি ডিও (আধা সরকারি পত্র) দিতে বলেছি। সেটি পাওয়া গেলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে রায়গঞ্জ পৌরসভায় স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়—এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখব।’উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ৬ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে রায়গঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়। ‘খ’ শ্রেণির এ পৌরসভায় রয়েছে ৯টি ওয়ার্ড। পৌরসভার বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৮২৭ জন।