মোঃ শাহ্ জালাল, ফরিদপুর ব্যুরো চীফ:
গরুর থাকার কথা যে ঘরে, সেখানেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রাত কাটে সোহেলের। বৃষ্টি হলে ভিজে যায় ঘরের মেঝে, শীতে বাড়ে দুর্ভোগ। নিজের নামে নেই এক শতাংশ জমিও। অসুস্থ স্ত্রী দুই কিডনি নষ্ট হয়ে ঘরবন্দী। অভাবের কারণে ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমেছে। এমন মানবেতর জীবনযাপনের খবর পেয়ে এবার পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের পরিবারের চিত্র এটি। দীর্ঘদিন ধরে অন্যের গোয়ালঘরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। তাঁর স্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। ফলে খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে।সংসারের অভাবের কারণে ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে স্থানীয় একটি দোকানে কাজ করছে। সাত বছর বয়সী ছোট ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনাও কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে শঙ্কায় পরিবারটি।পরিবারটির দুরবস্থার খবর পেয়ে গত শুক্রবার বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের বসবাসের স্থানে যান ইউএনও দবির উদ্দিন। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের বসবাসের অবস্থা সরেজমিনে দেখেন।স্থানীয়রা জানান, ছোট ও স্যাঁতসেঁতে গোয়ালঘরটির এক পাশে পরিবারের সামান্য জিনিসপত্র রাখা। অন্য পাশে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন সোহেল। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে পরিবারটির জীবন অনেকটাই থমকে গেছে।সোহেলের স্ত্রী একসময় ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করতেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, “পরিবারটির জন্য একটি স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।”স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটির এমন দুরবস্থা দেখে আসছি। তাঁদের থাকার জন্য একটি ঘর ও চিকিৎসার ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন।”সোহেলের পরিবারের অবস্থা দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, “পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাঁদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই, আবার আয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।”তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও চেষ্টা করা হবে।প্রশাসনের এমন উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবারটির সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একটি নিরাপদ ঘর যেমন তাঁদের মাথা গোঁজার স্থায়ী আশ্রয় দিতে পারে, তেমনি দোকানের ব্যবস্থা হলে তৈরি হতে পারে নিয়মিত আয়ের পথ।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে সোহেলের পরিবারকে আর অন্যের গোয়ালঘরে বসবাস করতে হবে না। একই সঙ্গে বড় ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও ভবিষ্যতে কাটিয়ে উঠবে পরিবারটি।দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা সোহেলের পরিবারের কাছে প্রশাসনের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ঘরের আশ্বাস নয়; এটি নিরাপদ ঠিকানা ও স্বাবলম্বী জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা।