খোলা বার্তা ডেস্ক:
সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে কঠোর অনুশীলন করে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রমিলা ফুটবল দল। প্রতিদিন মাঠে ঘাম ঝরিয়ে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চান দলটির খেলোয়াড়রা।ফুটবল তাদের কাছে শুধু খেলা নয়; স্বপ্ন পূরণ, আত্মপরিচয় তৈরি এবং নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের মাধ্যম। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতিদিন মাঠে ছুটে আসেন এসব তরুণী। সকাল কিংবা বিকেলে চলে দৌড়, শরীরচর্চা, বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, ড্রিবলিং, শুটিং ও গোলকিপিংয়ের অনুশীলন।দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই তাদের অনেকের বেড়ে ওঠা। পরিবারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাদের মাঠে টেনে আনে। ভালো প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চান তারা।দলের খেলোয়াড় নিবেদিতা রানী মাহাতো ও বর্ষা মাহাতো বলেন, ‘ফুটবল আমাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন। লেখাপড়ার পাশাপাশি আমরা নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করছি। ভালো প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিন বড় পর্যায়ে খেলতে চাই। দেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নও রয়েছে।’খেলোয়াড় প্রিথা মাহাতো ও মোহনা উরাও বলেন, তাদের একাডেমি থেকে অয়ন্ত বালা মাহাতো (২০) ও তিথী রানী মাহাতো (১৭) জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া অনামিকা উরাও ফুটসাল লিগে খেলেছেন। তাদের অনুপ্রেরণায় তারাও জাতীয় পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন দেখছেন।তারা বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম ও ভালোভাবে অনুশীলনের সুযোগ পেলে আমরা নিজেদের প্রতিভা আরও ভালোভাবে তুলে ধরতে পারব। সমাজের সবাই পাশে দাঁড়ালে ও উৎসাহ দিলে আমাদের স্বপ্ন পূরণের পথ সহজ হবে।’সুষমিতা রানী মাহাতো ও সঞ্চীতা উরাও বলেন, নিয়মিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উন্নতমানের ক্রীড়া সরঞ্জাম, অনুশীলনের উপযোগী মাঠ, পুষ্টিকর খাবার এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়ানুরাগী ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তাদের স্বপ্নপূরণের পথ আরও সহজ হবে।দলের প্রশিক্ষক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক নিহারঞ্জন বলেন, ২০১০ সাল থেকে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত নিমগাছি হাইস্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে একাডেমিতে প্রায় ৬০ জন মেয়ে খেলোয়াড় রয়েছে।নিহারঞ্জন বলেন, ‘খেলোয়াড়দের মধ্যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে তারা আরও ভালো করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।’তিনি আরও বলেন, তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক মেয়ে বর্তমানে জাতীয় দলসহ দেশের বিভিন্ন বড় দলে খেলছে।স্থানীয়রা জানান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদের ফুটবলে অংশগ্রহণ এলাকায় ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। খেলাধুলার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তাদের দেখে এলাকার অন্য মেয়েরাও খেলাধুলায় আগ্রহী হচ্ছে।রায়গঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার এসব তরুণী ফুটবলারের স্বপ্ন এখন জাতীয় পর্যায় ছুঁয়ে যাওয়ার। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া সরঞ্জাম ও সহযোগিতা পেলে তারা একদিন সিরাজগঞ্জের পাশাপাশি দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও সুনাম বয়ে আনবেন—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।