ঢাকা    বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
খোলা বার্তা

খোলা কলাম

বৃদ্ধার ‘শিরশ্ছেদ’ কীসের আলামত?

খুনের খবরে এখন আর মন বিচলিত হয় না। সংবাদ মাধ্যমেও খুনের খবর তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। পাবেই-বা কেন? যা নিত্য ঘটে, সেটার তো সংবাদ মূল্য কমে যায়। সংবাদপত্রে বহুদিন ধরেই খুন কম্পাইল স্টোরি হচ্ছে। চার স্থানে ৫ খুন; বাবার হাতে ছেলে কিংবা ছেলের হাতে বাবাসহ তিন স্থানে ৪ খুন ইত্যাদি শিরোনামে এসব খবর ছাপা হচ্ছে। কিন্তু সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার একটি খুনের খবর আমাকে বেশ চিন্তিত করে তুলেছে। অজানা শঙ্কা মনে উঁকি দিচ্ছে। কোনোভাবেই অস্বস্তি কাটছে না। চকবরুভেংড়ী গ্রামের নওশের মোল্লার স্ত্রী সন্দেশ বেগমের (৮৫) শিরশ্ছেদ করেছে তার নাতি সজিব আলী মোল্লা (২২)। কোলেপিঠে করে বড় করা নাতির হাতে বুধবার মধ্যরাতে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় আত্মীয়-স্বজন তো বটেই, পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কিন্তু অশীতিপর এই নারীর অপরাধ কী? কেন তাকে খুন হতে হলো? তার ‘অপরাধ’ তিনি তার রবের নাম বলতে পারেননি!নিহতের ছোট ছেলে আইয়ুব আলীর ভাষ্য, বুধবার রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে তার মা সন্দেশ বেগম তার তৃতীয় ছেলে আহাম্মদ মোল্লার একতলা বাসভবনের একটি কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। তার শয়ন কক্ষের পাশের কক্ষে থাকেন আহাম্মদ মোল্লার ছেলে সজিব আলী মোল্লা। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সজিব গরু জবাই করার ধারালো একটি বড় ছুরি হাতে দাদির কক্ষে প্রবেশ করে। এরপর তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানতে চায়, ‘তোমার রব কে?’। সন্দেশ বেগম এর উত্তর বলতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে সে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘তাহলে তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না’। এরপর হাতে থাকা ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে দেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার চিৎকার শুনে তিনি ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে দেখতে পান তার মায়ের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। আর ঘাতক সজিব ট্যাপের নিচে মাথা দিয়ে নিজের মাথায় নিজেই পানি ঢালছে। (দেশ রূপান্তর, ২৩ অক্টোবর ২০২৫)।সজিব মোল্লা তার ফেসবুক আইডিতে ‘আল্লাহু আকবার’ লিখে একটি স্ট্যাটাস দেন। কিছুক্ষণ পর আবারও ‘ইনশা আল্লাহ একটাও ছাড় পাবে না’ লিখে আরেকটি স্ট্যাটাস দেন। বিষয়টি সজিবের বাবা আহম্মাদ আলীর নজরে এলে তিনি চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করেন। তখন পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে হত্যার ঘটনা দেখে পুলিশে খবর দেন। সজিব মোল্লা সম্প্রতি এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ঢাকায় কোচিং করছিলেন। হঠাৎ কিছুটা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ হয়ে পড়ায় তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এর পর থেকে কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। (প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০২৫)।এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। গভীর রাতে একটি ছেলে তার দাদিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানতে চাইল যে তার রব কে? বৃদ্ধা দাদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। এটা তার অপরাধ? এ কারণে তার প্রাণ নিয়ে নিল ছেলেটি? এই প্রাণ নেওয়ার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? তাকে অপ্রকৃতিস্থ দাবি করা হচ্ছে। অপ্রকৃতিস্থ হলে তাকে কেন নজরদারিতে রাখা হয়নি? সে বড় ছুরি পেল কীভাবে? ফেসবুকে সে দুটি স্ট্যাটাস দিয়েছে। সে প্রথমে লিখেছে ‘আল্লাহু আকবার’। এর অর্থ আল্লাহ মহান। এ নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ নেই। কিন্তু তার দ্বিতীয় স্ট্যাটাস ‘ইনশা আল্লাহ একটাও ছাড় পাবে না’র অর্থ কী? এর অর্থ দাঁড়ায় সে একটা খুন করেছে। তার টার্গেটে আরও কয়েকজন বা অনেকে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করলে হয়তো সে আরও প্রাণ নিত। তার এই দুটি স্ট্যাটাস বলছে সে সুস্থ। খুনের দায় থেকে বাঁচাতে কিংবা শাস্তি কমাতে তাকে অপ্রকৃতিস্থ দাবি করা হচ্ছে না তো? আরেকটি বিষয় হলো ছেলেটি এইচএসসি পাশ করেছে। সে ঢাকায় এসেছিল কোচিং করতে। নিশ্চয়ই তার স্বপ্ন ছিল ভালো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। অথচ সে আজ খুনি। কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি। ঢাকায় কী কেউ তার ব্রেইন ওয়াশ করেছে? কেউ কী তাকে উগ্রপন্থায় নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করেছে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।সজিব আলী যে উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হয়েছে, তার ইঙ্গিত মেলে সলঙ্গা থানার ওসি একরামুল হকের কথাতেও। তার ভাষ্য, ‘লাশটি (সন্দেশ বেগম) উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ওই বৃদ্ধাকে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ছোট ছেলে আইয়ুব আলী বাদী হয়ে সজিবকে আসামি করে বৃহস্পতিবার দুপুরে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। সজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। (প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০২৫)।ওসি একরামুল হক সচেতনভাবেই শিরশ্ছেদ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। হয়তো তিনি আসামি সজিব আলীর সাথে কথা বলেছেন এবং সজিব শিরশ্ছেদ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। ওসি সেই কথাটিই বলেছেন। এবার আসিশিরশ্ছেদ সম্পর্কে। শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ শির+ ছেদ। শির অর্থ মাথা আর ছেদ অর্থ বাদ দেওয়া। তাহলে শিরশ্ছেদ অর্থ মাথা বাদ দেওয়া বা মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা। শরীয়াহ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (শিরশ্ছেদ)। মধ্যমাচ্যের অনেক দেশেই এক সময় শিরশ্ছেদ করা হতো। এখন কেবল সৌদি আরবে এই শাস্তি কার্যকর করার বিধান আছে। অন্যান্য দেশে ফাঁসি কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।সৌদি বিচার বিভাগ শরীয়াহ আইনে তিন ধরনের ফৌজদারি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। ১. হুদুদ বা নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি। যেসব হুদুদ অপরাধের ফলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ধর্মত্যাগ, ব্যভিচার ও সমকামীতা। প্রমাণ ও সাধারণত স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে রায় ঘোষণা করেন বিচারক। তবে ব্যভিচারের শাস্তি হল পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা। গত কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবে পাথর ছুঁড়ে হত্যার ঘটনা ঘটছে না। ২. কিসাস বা একই ধরনের শাস্তি। যেমন চোখের বদলে চোখের প্রতিশোধমূলক শাস্তি। কিসাস অপরাধের মধ্যে হত্যা অন্তর্ভুক্ত। খুনের শিকার ব্যক্তির পরিবার মৃত্যুদণ্ড দাবি করতে পারে অথবা অপরাধীর ‘দিয়ার’ (অনিচ্ছাকৃত খুনের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ) বিনিময়ে ক্ষমা চাইতে পারে  অথবা রক্তের মূল্য দিতে পারে। রক্তের মূল্যের পরিমাণ যথেষ্ট হতে পারে। ৩. তাজির। এটি একটি সাধারণ বিভাগ; যার মধ্যে জাতীয় আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত অপরাধ অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলোর কিছু অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। যেমন মাদক পাচার। ২০১৪ সালে ৫ আগস্ট কালো জাদু ও জাদুবিদ্যা অনুশীলনের দায়ে মোহাম্মদ বিন বকর আল-আলাউই নামে একজনের শিরশ্ছেদ করা হয়। একই অভিযোগে ২০১১ সালে এক অ্যারাবিয়ান নারী ও সুদানি এক পুরুষকেশিরশ্ছেদ করা হয়।প্রশ্ন জাগতে পারে শিরশ্ছেদ কীভাবে কার্যকর করা হয়? সাধারণত সকাল ৯টার দিকে জনসমক্ষে শিরশ্ছেদ করা হয়। দণ্ডিত ব্যক্তিকে আদালতের কাছের একটি উঠোনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জল্লাদের সামনে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা দণ্ডিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত অপরাধের কথা ঘোষণা করেন। জল্লাদ সুলতান নামে একটি তরবারি ব্যবহার করে দণ্ডিত ব্যক্তির শরীর থেকে মাথা সরিয়ে ফেলেন। একজন মেডিকেল পরীক্ষক দেহটি পরীক্ষা করেন এবং তারপর দোষীকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা শিরশ্ছেদ করা আসামির দ্বারা সংঘটিত অপরাধের কথা আবার ঘোষণা করেন এবং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। পেশাদার জল্লাদরা একদিনে ১০ জনেরও বেশি লোকের শিরশ্ছেদ করেছেন। গত বছর সৌদি আরবে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।ফের আসি সজিব আলী সম্পর্কে। সে কী তার দাদির শিরশ্ছেদ করার মধ্যদিয়ে এ দেশে শরীয়াহ আইন চালু করতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। লেখক: সম্পাদক, আন্দোলন ডটনেট।

বৃদ্ধার ‘শিরশ্ছেদ’ কীসের আলামত?