উন্নয়ন মানুষের সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়—এ কথা সত্য। বিদ্যুৎ, শিল্প, সড়ক, সেতু ও আধুনিক অবকাঠামো ছাড়া আজকের পৃথিবী অচল। কিন্তু উন্নয়নের নামে প্রকৃতির সীমা অস্বীকার করলে সেই উন্নয়নই একদিন মানুষের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হিমবিপর্যয় আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার তুলে ধরেছে।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও বিপুল পানির স্রোত নিচের জনপদে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি নদী ধ্বংসের স্রোতে পরিণত হয়। বসতি, সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, স্কুল এবং জনপদের বহু অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি প্রাণহানি ও নিখোঁজের।
৩১ আগস্ট পর্যন্ত নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৪ হাজার ২৪৭ জন এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। সীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং এলাকায় ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ দুই অঞ্চলে মিলিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা ৯১৯ জন, আর নিখোঁজ ৪ হাজার ৭৯৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। উদ্ধার ও শনাক্তকরণ অব্যাহত থাকায় এ সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে পাহাড়ের বুকের নিচে।
দুর্গত রাসুয়া ও নুওয়াকোট এলাকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ ও কার্যক্রম চলছিল। পাহাড়ের ভেতর দীর্ঘ টানেল খনন করে নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। ভয়াবহ ধস ও বন্যার পর ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে প্রায় ৯৩৩ শ্রমিক আটকা পড়েছেন বা আটকা পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। টানেলের মুখ কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
কী নির্মম পরিহাস!
যে মানুষগুলো পাহাড়ের বুকের নিচে নেমেছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য—প্রকৃতির একটি ভয়াবহ অভিঘাতে সেই পাহাড়ের বুকই তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক সভ্যতা চলে না। নেপালের মতো পাহাড়ি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে জলবিদ্যুৎও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের কি কোনো সীমা নেই?
হিমালয় বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমবাহ গলছে, বরফ ও জমাট মাটি দুর্বল হচ্ছে এবং পাহাড়ের ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতার মধ্যে পাহাড়ের বুক চিরে দীর্ঘ টানেল, নদীর ওপর বৃহৎ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপত্যকায় বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু করার আগে সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হিসাব কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছিল?
যদি হিমবাহ ভেঙে পড়ে?
যদি পাহাড় ধসে যায়?
যদি কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি নদী মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়?
পাহাড়ের নিচে টানেলে থাকা শ্রমিকদের কীভাবে বের করে আনা হবে?
আগাম সতর্কসংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু নেপালের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য জরুরি।
কারণ প্রকৃতি কোনো প্রকল্পের নকশা দেখে তার নিয়ম বদলায় না।
নদী কোনো বিনিয়োগের হিসাব বোঝে না।
পাহাড় কোনো সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতি বাধ্য নয়।
হিমবাহ কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে ভেঙে পড়া বন্ধ রাখে না।
প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। মানুষ সেই নিয়মকে উপেক্ষা করলে তার প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তদন্ত ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে এই হিমবিপর্যয়ের সরাসরি কারণ বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির মধ্যে উন্নয়নের ধরন কতটা নিরাপদ ছিল, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই বিপর্যয়কে ঘিরে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিব্বত অংশে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং স্বাধীনভাবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ এসেছে। বিপর্যয়ের ছবি ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে নেপালেও বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র ও অনুমতির নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে।
তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রমাণিত হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় সত্য—তথ্যের দরজা বন্ধ হলে সন্দেহের দরজা খুলে যায়।
যেখানে সাংবাদিক যেতে পারেন না, সেখানে গুজব জন্ম নেয়।
যেখানে গবেষক তথ্য যাচাই করতে পারেন না, সেখানে সত্য আড়ালে থাকার আশঙ্কা বাড়ে।
যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা স্বাধীনভাবে শোনা যায় না, সেখানে সরকারি বিবৃতিই একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
কিন্তু প্রকৃতির বিপর্যয় কোনো বিবৃতিতে ঢাকা যায় না।
পাহাড় ভেঙে পড়লে তাকে গোপন করা যায় না। নদী জনপদ ভাসিয়ে দিলে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে সেই পানি ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। মানুষের মৃত্যু কোনো ভাষার কারসাজিতে কমিয়ে দেওয়া যায় না।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এখানেই—আমরা মনে করি প্রকৃতি সবকিছু সহ্য করতে পারে।
আজ একটি পাহাড় কাটা হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি নদীর গতিপথ বদলানো হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি বন উজাড় হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি জলাভূমি ভরাট হলো—কিছুই হলো না।
মানুষ ভাবে, প্রকৃতি সব ভুলে গেছে।
কিন্তু প্রকৃতি ভুলে যায় না।
সে নীরবে পরিবর্তন জমা রাখে। পাহাড়ের ভেতরের ফাটল বড় হতে থাকে, হিমবাহ গলতে থাকে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, বন হারালে মাটি তার শক্তি হারায়। তারপর একদিন সেই জমে থাকা পরিবর্তন বিস্ফোরিত হয়।
একটি পাহাড় ধসে পড়ে।
একটি হিমবাহ ভেঙে যায়।
একটি নদী মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়।
একটি জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আমরা তখন তাকে বলি—প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
কিন্তু সব দুর্যোগ কি শুধু প্রকৃতির? নাকি মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিপদকে আরও ভয়ংকর করে তোলে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে দিতে হবে।
আমরা আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি, কিন্তু তাদের জন্য কি নিরাপদ পাহাড় রেখে যাচ্ছি? আমরা শিল্প গড়ছি, কিন্তু তাদের জন্য কি নির্মল বাতাস রেখে যাচ্ছি? আমরা নদী নিয়ন্ত্রণ করছি, কিন্তু তাদের জন্য কি জীবন্ত নদী রেখে যাচ্ছি? উন্নয়নের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছি, কিন্তু তাদের জন্য কি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাচ্ছি?
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলে আবার নির্মাণ করা যায়। একটি সেতু ভেঙে গেলে আবার তৈরি করা যায়। একটি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে নির্মাণ করা যায়।
কিন্তু হাজার বছরের একটি হিমবাহ ধ্বংস হলে তা ফিরিয়ে আনা যায় না।
একটি মৃত নদীকে আগের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
আর একটি মানুষের জীবন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প ফিরিয়ে দিতে পারে না।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু নেপালের নয়; এটি সমগ্র হিমালয় ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশও হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এখনই উন্নয়নের ভাষা বদলাতে হবে।
উন্নয়ন হবে, কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, কিন্তু মানুষের জীবনকে বাজি রেখে নয়।
পাহাড়ে প্রকল্প হবে, কিন্তু পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নয়।
আর কোনো দুর্যোগের তথ্য জনগণের কাছ থেকে আড়াল করে নয়।
আগামী প্রজন্ম আমাদের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা জানতে চাইবে না। তারা জানতে চাইবে—আমরা তাদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে গেছি।
নেপালের হিমবিপর্যয় আজ আমাদের সামনে সেই নির্মম প্রশ্নটিই রেখে গেছে—
প্রকৃতির সঙ্গে খেলা হয়তো আজ মুনাফা দেয়। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া যখন আসে, তখন মূল্য দিতে হয় প্রাণ দিয়ে। আর সবচেয়ে বড় মূল্যটি দিতে হয়—আগামী প্রজন্মকে।
লেখক: সাংবাদিক। সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ।
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সিরাজগঞ্জ জেলা শাখা।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উন্নয়ন মানুষের সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়—এ কথা সত্য। বিদ্যুৎ, শিল্প, সড়ক, সেতু ও আধুনিক অবকাঠামো ছাড়া আজকের পৃথিবী অচল। কিন্তু উন্নয়নের নামে প্রকৃতির সীমা অস্বীকার করলে সেই উন্নয়নই একদিন মানুষের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হিমবিপর্যয় আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার তুলে ধরেছে।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও বিপুল পানির স্রোত নিচের জনপদে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি নদী ধ্বংসের স্রোতে পরিণত হয়। বসতি, সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি, স্কুল এবং জনপদের বহু অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি প্রাণহানি ও নিখোঁজের।
৩১ আগস্ট পর্যন্ত নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৪ হাজার ২৪৭ জন এখনও নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। সীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং এলাকায় ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ দুই অঞ্চলে মিলিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা ৯১৯ জন, আর নিখোঁজ ৪ হাজার ৭৯৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। উদ্ধার ও শনাক্তকরণ অব্যাহত থাকায় এ সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়টি লুকিয়ে আছে পাহাড়ের বুকের নিচে।
দুর্গত রাসুয়া ও নুওয়াকোট এলাকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ ও কার্যক্রম চলছিল। পাহাড়ের ভেতর দীর্ঘ টানেল খনন করে নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। ভয়াবহ ধস ও বন্যার পর ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে প্রায় ৯৩৩ শ্রমিক আটকা পড়েছেন বা আটকা পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। টানেলের মুখ কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
কী নির্মম পরিহাস!
যে মানুষগুলো পাহাড়ের বুকের নিচে নেমেছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য—প্রকৃতির একটি ভয়াবহ অভিঘাতে সেই পাহাড়ের বুকই তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক সভ্যতা চলে না। নেপালের মতো পাহাড়ি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে জলবিদ্যুৎও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের কি কোনো সীমা নেই?
হিমালয় বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমবাহ গলছে, বরফ ও জমাট মাটি দুর্বল হচ্ছে এবং পাহাড়ের ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতার মধ্যে পাহাড়ের বুক চিরে দীর্ঘ টানেল, নদীর ওপর বৃহৎ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপত্যকায় বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু করার আগে সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাব্য বিপর্যয়ের হিসাব কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছিল?
যদি হিমবাহ ভেঙে পড়ে?
যদি পাহাড় ধসে যায়?
যদি কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি নদী মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়?
পাহাড়ের নিচে টানেলে থাকা শ্রমিকদের কীভাবে বের করে আনা হবে?
আগাম সতর্কসংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা কী ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু নেপালের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য জরুরি।
কারণ প্রকৃতি কোনো প্রকল্পের নকশা দেখে তার নিয়ম বদলায় না।
নদী কোনো বিনিয়োগের হিসাব বোঝে না।
পাহাড় কোনো সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতি বাধ্য নয়।
হিমবাহ কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে ভেঙে পড়া বন্ধ রাখে না।
প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। মানুষ সেই নিয়মকে উপেক্ষা করলে তার প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তদন্ত ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে এই হিমবিপর্যয়ের সরাসরি কারণ বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির মধ্যে উন্নয়নের ধরন কতটা নিরাপদ ছিল, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই বিপর্যয়কে ঘিরে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিব্বত অংশে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং স্বাধীনভাবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ এসেছে। বিপর্যয়ের ছবি ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে নেপালেও বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র ও অনুমতির নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে।
তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রমাণিত হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় সত্য—তথ্যের দরজা বন্ধ হলে সন্দেহের দরজা খুলে যায়।
যেখানে সাংবাদিক যেতে পারেন না, সেখানে গুজব জন্ম নেয়।
যেখানে গবেষক তথ্য যাচাই করতে পারেন না, সেখানে সত্য আড়ালে থাকার আশঙ্কা বাড়ে।
যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা স্বাধীনভাবে শোনা যায় না, সেখানে সরকারি বিবৃতিই একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
কিন্তু প্রকৃতির বিপর্যয় কোনো বিবৃতিতে ঢাকা যায় না।
পাহাড় ভেঙে পড়লে তাকে গোপন করা যায় না। নদী জনপদ ভাসিয়ে দিলে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে সেই পানি ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। মানুষের মৃত্যু কোনো ভাষার কারসাজিতে কমিয়ে দেওয়া যায় না।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত এখানেই—আমরা মনে করি প্রকৃতি সবকিছু সহ্য করতে পারে।
আজ একটি পাহাড় কাটা হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি নদীর গতিপথ বদলানো হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি বন উজাড় হলো—কিছুই হলো না।
আজ একটি জলাভূমি ভরাট হলো—কিছুই হলো না।
মানুষ ভাবে, প্রকৃতি সব ভুলে গেছে।
কিন্তু প্রকৃতি ভুলে যায় না।
সে নীরবে পরিবর্তন জমা রাখে। পাহাড়ের ভেতরের ফাটল বড় হতে থাকে, হিমবাহ গলতে থাকে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, বন হারালে মাটি তার শক্তি হারায়। তারপর একদিন সেই জমে থাকা পরিবর্তন বিস্ফোরিত হয়।
একটি পাহাড় ধসে পড়ে।
একটি হিমবাহ ভেঙে যায়।
একটি নদী মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়।
একটি জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আমরা তখন তাকে বলি—প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
কিন্তু সব দুর্যোগ কি শুধু প্রকৃতির? নাকি মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিপদকে আরও ভয়ংকর করে তোলে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে দিতে হবে।
আমরা আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি, কিন্তু তাদের জন্য কি নিরাপদ পাহাড় রেখে যাচ্ছি? আমরা শিল্প গড়ছি, কিন্তু তাদের জন্য কি নির্মল বাতাস রেখে যাচ্ছি? আমরা নদী নিয়ন্ত্রণ করছি, কিন্তু তাদের জন্য কি জীবন্ত নদী রেখে যাচ্ছি? উন্নয়নের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছি, কিন্তু তাদের জন্য কি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাচ্ছি?
একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলে আবার নির্মাণ করা যায়। একটি সেতু ভেঙে গেলে আবার তৈরি করা যায়। একটি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে নির্মাণ করা যায়।
কিন্তু হাজার বছরের একটি হিমবাহ ধ্বংস হলে তা ফিরিয়ে আনা যায় না।
একটি মৃত নদীকে আগের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
আর একটি মানুষের জীবন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প ফিরিয়ে দিতে পারে না।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু নেপালের নয়; এটি সমগ্র হিমালয় ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশও হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এখনই উন্নয়নের ভাষা বদলাতে হবে।
উন্নয়ন হবে, কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, কিন্তু মানুষের জীবনকে বাজি রেখে নয়।
পাহাড়ে প্রকল্প হবে, কিন্তু পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নয়।
আর কোনো দুর্যোগের তথ্য জনগণের কাছ থেকে আড়াল করে নয়।
আগামী প্রজন্ম আমাদের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা জানতে চাইবে না। তারা জানতে চাইবে—আমরা তাদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে গেছি।
নেপালের হিমবিপর্যয় আজ আমাদের সামনে সেই নির্মম প্রশ্নটিই রেখে গেছে—
প্রকৃতির সঙ্গে খেলা হয়তো আজ মুনাফা দেয়। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া যখন আসে, তখন মূল্য দিতে হয় প্রাণ দিয়ে। আর সবচেয়ে বড় মূল্যটি দিতে হয়—আগামী প্রজন্মকে।
লেখক: সাংবাদিক। সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ।
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সিরাজগঞ্জ জেলা শাখা।

আপনার মতামত লিখুন