ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খোলা বার্তা

চোখে দেখা হাওরের বিস্ময়



চোখে দেখা হাওরের বিস্ময়
চোখে দেখা হাওরের বিস্ময়


মো: আজিজুল হক 

ভ্রমণ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং চিন্তা শক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। জ্ঞানের পরিধিও বিস্তৃত হয়। আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টির নিদর্শনগুলো মানুষকে তাঁর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের  উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহল এবং অজানাকে জানার উদ্দেশ্যেই ভ্রমণপ্রিয় হয়ে থেকে। সবার মতো আমারও ভ্রমণ করতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু কাজের চাপ আর ছুটির অভাবে যাওয়া হয় না। হাফেজি মাদ্রাসায় বিশেষ কিছু নির্ধারিত ছুটি ছাড়া ২৪ ঘন্টা মাদ্রাসায় কাটাতে হয়। আবার বিশেষ সেই ছুটি পেলে পকেট থাকে শূন্য! সময় আর টাকা একসাথে আমার কাছে ধরা দেয় না। একঘেয়েমি কাটাতে সহধর্মিণী বায়না ধরলো এবার ছুটিতে নতুন কোনো জায়গায় যেতেই হবে। নিরূপায় হয়ে বললাম, ঠিক আছে। মনে মনে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর স্রোত আর সৌন্দর্য উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতিমধ্যে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়ার বিজ্ঞাপন দেখলাম। খোঁজ খবর নিতে মেসেজ দিলাম। ফিরতি মেসেজে ভদ্রলোক জানালেন, "ভাই, আমি আপনাকে চিনি। আপনি পত্রিকায় লেখালেখি করেন। আমাদের সাথে সফর করতে চাইলে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার বাড়িও কাহালুতে।" আশ্বস্ত হয়ে টিকিট কনফার্ম করলাম। রওনা ৭ আগষ্ট ২০২৫ ইং রাত ৮ টায় বগুড়া থেকে। বন্ধুবর হাফেজ মেহেদি হাসানের সাথে আগেই নির্ধারিত ছিল ৭ই আগষ্টে দুইজনের পরিবারসহ ঘুরাঘুরির। সুতরাং ৭ আগষ্ট সকালে বের হয়ে সারিয়াকান্দির কালীতলাঘাট, গ্রোয়েন বাঁধ, প্রেম যমুনার ঘাট, স্লুইস গেট, যমুনার চর ও সবুজ প্রকৃতিসহ বাঙালি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্রমণ করলাম। সন্ধ্যা বেলায় হাফেজ মেহেদি বগুড়া হতে বাড়ি ফিরলেও আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে রাখা বাসে চড়ে বসলাম। নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছাড়লো এবং সারারাত গাড়ি ছুটে চললো। যাত্রাপথে বিরতির সময় হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। কাকডাকা ভোরে গিয়ে নামলাম নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দায়। সেখানে আগে থেকেই নির্বাচিত হাউসবোটে রওনা দিলাম হাওরের উদ্দেশ্যে। তখন শুরু হয় উত্তেজনা আর ভ্রমণের আসল রোমাঞ্চ। অপূর্ব সুন্দর এই প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্ময় আমাদের বাংলাদেশ। রূপময় বাংলাদেশের রূপের লীলাভূমি এই টাঙ্গুয়ার হাওর। রূপকথার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্যে এটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত, যা ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলার মধ্যে বিস্তৃত। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। স্থানীয়ভাবে "নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল" নামে হাওরটি পরিচিত। শীতকালে যখন হাওরের পানি কমে যায়, তখন ছোট বড় বিলগুলোর চারপাশে পাড় জেগে ওঠে। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে "কান্দা" বলে। আর বিলের ভিতরের জলাশয়গুলো "বিল" নামে পরিচিত হয়। মূলত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য - প্রাচুর্য এবং বিশালতা বুঝানোর জন্য এই বাক্য বলা হয়। বর্ষার ভরপুর পানিতে ডুবো ডুবো গ্রাম এবং গাছপালা ভ্রমণকে জীবন্ত করে তুললো। প্রাকৃতিক সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা মূল হাওরে পৌঁছলাম। শত বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরের মাঝে এক জায়গায় আমাদের  হাউসবোট থামলো। আহ! চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির এমন মনকাড়া রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনকে উদাসী করে তোলে। তখন কবিদের মাথায় অনবরত নতুন নতুন কবিতার ভবের উদয় হয়। লেখকগণ খুঁজে পান লেখার চমৎকার রসদ। উপরে খোলা আকাশ, নিচে অথৈ পানি আর দূর পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছিল প্রাকৃতিক এই রূপসী কন্যা। সারিবদ্ধ হিজল ও করচ গাছ সেই সৌন্দর্যের শোভাবর্ধক। যাহোক, ছোট ছোট নৌকা আমাদের হাউসবোটের কাছে এসে ভিড় করলো। আমরা কয়েকজন লাইফ জ্যাকেট পড়ে কিশোর বয়সী এক ছেলের নৌকায় চড়ে ওয়াচ টাওয়ারের ( হাওরের মাঝের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার) দিকে রওনা দিলাম। কিশোর মাঝি উচ্চস্বরে গান ধরলো, "মন বসে না শহরে..."। সুরালো কণ্ঠে গান আর নৌকায় চড়ে হাওরের স্বচ্ছ পানির বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি অসাধারণ। নৌকার গতি কমিয়ে ওয়াচ টাওয়ারের কাছাকাছি থামানো হলো। ক্ষণিকের জন্য ফিরে গেলাম শৈশবে, শুরু করলাম লাফঝাঁপ। কখনো গাছের উপর থেকে লাফ, আবার কখনো ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে ঝাঁপ। সেখানে কেউ কেউ নৌকায় ফেরি করে দোকানদারি করছিল। ভেজা শরীরে গরম চায়ের অনুভূতি এখনো মনে আছে। ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে চারপাশের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি ও মেঘালয়ের পাহাড়ের এক অপূর্ব প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে পড়ে। গোছল সেরে আবার সেই ছোট্ট নৌকায় চড়ে ফিরে এলাম হাউসবোটে। হাওরের মাঝে হাউসবোটের ছাদে বসে দুপুরের মজাদার খাবার খাওয়ার অনুভূতি এককথায় অন্যন্য। এবার বোটটি বিস্তৃত জলরাশি ভেদ করে ছুটে চললো টেকেরঘাট। টেকেরঘাটে নেমে নীলাদ্রি লেকের পাশে দাঁড়ালাম। হাওর ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো টেকেরঘাট এলাকার শহীদ সিরাজ লেক, যা " নীলাদ্রি লেক" নামে বেশি পরিচিত। চুনাপাথর খনির পরিত্যক্ত এই লেকের নীল পানি আর পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলাম। অত:পর চাঁন্দের গাড়িতে করে উঁচু নিচু ভয়াবহ পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে বারেক টিলা, সেখান থেকে শিমুল বাগানের অপরূপ সাজ ও যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলপ্রবাহ আমাদের ভ্রমণকে আরও প্রানবন্ত করে তুললো। পথিমধ্যে বনভূমির মনোমুগ্ধকর ঘন সবুজ গাছপালা এবং পত্রপল্লবের ফাঁকে রোদের লুকোচুরি খেলা এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করে। সুউচ্চ পাহাড় ও মেঘের আলিঙ্গন এবং সেখান থেকে গড়িয়ে পড়া পাহাড়ি ঝরনার ছন্দময় শব্দে বিমোহিত হই। বিকেলে ফেরার পথে হাউসবোটের ছাদে বসে হাওরের বুকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা এককথায় জাদুকরি। সন্ধ্যার পর পুরো হাওরে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। হাউসবোটের মৃদু দোলানি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর পানির শব্দে অসম্ভব ভালো লাগলো। এই ভ্রমণ আমার জীবনের এক অনন্য অনুভূতি। বর্ষায় হাওর ভরা জলে ৭ বছরের মেয়ে আমাতুল্লাহি তুবা ও ৪ বছরের ছেলে মুহাম্মাদুল্লাহ আবরারের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরের বৈচিত্র্যময় রূপকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজ চোখে না দেখলে তা উপলব্ধি করা দুষ্কর। এখানকার প্রকৃতি খুবই সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। বর্ষায় হাওর একটু বেশিই সুন্দর। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

01734-718360

আপনার মতামত লিখুন

খোলা বার্তা

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


চোখে দেখা হাওরের বিস্ময়

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


মো: আজিজুল হক 

ভ্রমণ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং চিন্তা শক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। জ্ঞানের পরিধিও বিস্তৃত হয়। আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টির নিদর্শনগুলো মানুষকে তাঁর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের  উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহল এবং অজানাকে জানার উদ্দেশ্যেই ভ্রমণপ্রিয় হয়ে থেকে। সবার মতো আমারও ভ্রমণ করতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু কাজের চাপ আর ছুটির অভাবে যাওয়া হয় না। হাফেজি মাদ্রাসায় বিশেষ কিছু নির্ধারিত ছুটি ছাড়া ২৪ ঘন্টা মাদ্রাসায় কাটাতে হয়। আবার বিশেষ সেই ছুটি পেলে পকেট থাকে শূন্য! সময় আর টাকা একসাথে আমার কাছে ধরা দেয় না। একঘেয়েমি কাটাতে সহধর্মিণী বায়না ধরলো এবার ছুটিতে নতুন কোনো জায়গায় যেতেই হবে। নিরূপায় হয়ে বললাম, ঠিক আছে। মনে মনে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর স্রোত আর সৌন্দর্য উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতিমধ্যে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়ার বিজ্ঞাপন দেখলাম। খোঁজ খবর নিতে মেসেজ দিলাম। ফিরতি মেসেজে ভদ্রলোক জানালেন, "ভাই, আমি আপনাকে চিনি। আপনি পত্রিকায় লেখালেখি করেন। আমাদের সাথে সফর করতে চাইলে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার বাড়িও কাহালুতে।" আশ্বস্ত হয়ে টিকিট কনফার্ম করলাম। রওনা ৭ আগষ্ট ২০২৫ ইং রাত ৮ টায় বগুড়া থেকে। বন্ধুবর হাফেজ মেহেদি হাসানের সাথে আগেই নির্ধারিত ছিল ৭ই আগষ্টে দুইজনের পরিবারসহ ঘুরাঘুরির। সুতরাং ৭ আগষ্ট সকালে বের হয়ে সারিয়াকান্দির কালীতলাঘাট, গ্রোয়েন বাঁধ, প্রেম যমুনার ঘাট, স্লুইস গেট, যমুনার চর ও সবুজ প্রকৃতিসহ বাঙালি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্রমণ করলাম। সন্ধ্যা বেলায় হাফেজ মেহেদি বগুড়া হতে বাড়ি ফিরলেও আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে রাখা বাসে চড়ে বসলাম। নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছাড়লো এবং সারারাত গাড়ি ছুটে চললো। যাত্রাপথে বিরতির সময় হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। কাকডাকা ভোরে গিয়ে নামলাম নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দায়। সেখানে আগে থেকেই নির্বাচিত হাউসবোটে রওনা দিলাম হাওরের উদ্দেশ্যে। তখন শুরু হয় উত্তেজনা আর ভ্রমণের আসল রোমাঞ্চ। অপূর্ব সুন্দর এই প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিস্ময় আমাদের বাংলাদেশ। রূপময় বাংলাদেশের রূপের লীলাভূমি এই টাঙ্গুয়ার হাওর। রূপকথার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্যে এটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত, যা ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলার মধ্যে বিস্তৃত। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। স্থানীয়ভাবে "নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল" নামে হাওরটি পরিচিত। শীতকালে যখন হাওরের পানি কমে যায়, তখন ছোট বড় বিলগুলোর চারপাশে পাড় জেগে ওঠে। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে "কান্দা" বলে। আর বিলের ভিতরের জলাশয়গুলো "বিল" নামে পরিচিত হয়। মূলত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য - প্রাচুর্য এবং বিশালতা বুঝানোর জন্য এই বাক্য বলা হয়। বর্ষার ভরপুর পানিতে ডুবো ডুবো গ্রাম এবং গাছপালা ভ্রমণকে জীবন্ত করে তুললো। প্রাকৃতিক সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা মূল হাওরে পৌঁছলাম। শত বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরের মাঝে এক জায়গায় আমাদের  হাউসবোট থামলো। আহ! চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির এমন মনকাড়া রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনকে উদাসী করে তোলে। তখন কবিদের মাথায় অনবরত নতুন নতুন কবিতার ভবের উদয় হয়। লেখকগণ খুঁজে পান লেখার চমৎকার রসদ। উপরে খোলা আকাশ, নিচে অথৈ পানি আর দূর পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছিল প্রাকৃতিক এই রূপসী কন্যা। সারিবদ্ধ হিজল ও করচ গাছ সেই সৌন্দর্যের শোভাবর্ধক। যাহোক, ছোট ছোট নৌকা আমাদের হাউসবোটের কাছে এসে ভিড় করলো। আমরা কয়েকজন লাইফ জ্যাকেট পড়ে কিশোর বয়সী এক ছেলের নৌকায় চড়ে ওয়াচ টাওয়ারের ( হাওরের মাঝের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার) দিকে রওনা দিলাম। কিশোর মাঝি উচ্চস্বরে গান ধরলো, "মন বসে না শহরে..."। সুরালো কণ্ঠে গান আর নৌকায় চড়ে হাওরের স্বচ্ছ পানির বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি অসাধারণ। নৌকার গতি কমিয়ে ওয়াচ টাওয়ারের কাছাকাছি থামানো হলো। ক্ষণিকের জন্য ফিরে গেলাম শৈশবে, শুরু করলাম লাফঝাঁপ। কখনো গাছের উপর থেকে লাফ, আবার কখনো ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে ঝাঁপ। সেখানে কেউ কেউ নৌকায় ফেরি করে দোকানদারি করছিল। ভেজা শরীরে গরম চায়ের অনুভূতি এখনো মনে আছে। ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে চারপাশের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি ও মেঘালয়ের পাহাড়ের এক অপূর্ব প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে পড়ে। গোছল সেরে আবার সেই ছোট্ট নৌকায় চড়ে ফিরে এলাম হাউসবোটে। হাওরের মাঝে হাউসবোটের ছাদে বসে দুপুরের মজাদার খাবার খাওয়ার অনুভূতি এককথায় অন্যন্য। এবার বোটটি বিস্তৃত জলরাশি ভেদ করে ছুটে চললো টেকেরঘাট। টেকেরঘাটে নেমে নীলাদ্রি লেকের পাশে দাঁড়ালাম। হাওর ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো টেকেরঘাট এলাকার শহীদ সিরাজ লেক, যা " নীলাদ্রি লেক" নামে বেশি পরিচিত। চুনাপাথর খনির পরিত্যক্ত এই লেকের নীল পানি আর পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলাম। অত:পর চাঁন্দের গাড়িতে করে উঁচু নিচু ভয়াবহ পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে বারেক টিলা, সেখান থেকে শিমুল বাগানের অপরূপ সাজ ও যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলপ্রবাহ আমাদের ভ্রমণকে আরও প্রানবন্ত করে তুললো। পথিমধ্যে বনভূমির মনোমুগ্ধকর ঘন সবুজ গাছপালা এবং পত্রপল্লবের ফাঁকে রোদের লুকোচুরি খেলা এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করে। সুউচ্চ পাহাড় ও মেঘের আলিঙ্গন এবং সেখান থেকে গড়িয়ে পড়া পাহাড়ি ঝরনার ছন্দময় শব্দে বিমোহিত হই। বিকেলে ফেরার পথে হাউসবোটের ছাদে বসে হাওরের বুকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা এককথায় জাদুকরি। সন্ধ্যার পর পুরো হাওরে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। হাউসবোটের মৃদু দোলানি, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর পানির শব্দে অসম্ভব ভালো লাগলো। এই ভ্রমণ আমার জীবনের এক অনন্য অনুভূতি। বর্ষায় হাওর ভরা জলে ৭ বছরের মেয়ে আমাতুল্লাহি তুবা ও ৪ বছরের ছেলে মুহাম্মাদুল্লাহ আবরারের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরের বৈচিত্র্যময় রূপকে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নিজ চোখে না দেখলে তা উপলব্ধি করা দুষ্কর। এখানকার প্রকৃতি খুবই সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। বর্ষায় হাওর একটু বেশিই সুন্দর। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

01734-718360


খোলা বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. একরামুল হক
✆ ০১৯২৮-৩১৩১২০
প্রধান নির্বাহী : সাইদুল ইসলাম আবির।
✆ ০১৭৫০-৭০৭৬৩৬
ই মেইল: kholabartaonline@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ খোলা বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত