ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
খোলা বার্তা

শস্যসম্ভারে গুমাই বিলের নবজাগরণ



শস্যসম্ভারে গুমাই বিলের নবজাগরণ
গুমাই বিলের দৃশ্য

রাঙ্গুনিয়ার কৃষি–অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত গুমাই বিল আজ দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনার চাপে দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

 একসময় যে বিল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেই বিলের জমি আজ ভূমিদস্যুদের দখল ও ইটভাটার বিকাশে ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। স্থানীয় কৃষক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহল—সকলেই সতর্ক করছেন, এখনই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নিলে গুমাই বিলে উৎপাদনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।




ঐতিহ্যের ইতিহাস : ঝিল থেকে শস্যভাণ্ডার


ঐতিহাসিকভাবে গুমাই এলাকা ছিল এক বিশাল প্রাকৃতিক ঝিল। প্রচুর প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত বলে এটি স্থানীয়দের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল। ১৯৪৫ সালে স্থানীয় কৃষিপ্রেমী আবদুল বারী তালুকদার ঝিলটি সংস্কার করে আধুনিক কৃষিকাজ আরম্ভ করেন। তার উদ্যোগে ঝিলটি বিস্তৃত কৃষিজমিতে রূপ নিয়ে গুমাই বিলে পরিণত হয়। পাকিস্তান আমলে ধান চাষ শুরু হলেও স্বাধীনতার পর সেচব্যবস্থার উন্নয়নে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।


সময়ের ধারায় গুমাই বিল হয়ে ওঠে রাঙ্গুনিয়ার “শস্যভাণ্ডার” এবং স্থানীয় কৃষকের প্রধান ভরসাস্থল।



বিলে বিস্তৃতি ও উৎপাদন সক্ষমতা


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা, মরিয়মনগর, হোসনাবাদ, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া, লালানগরসহ পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডজুড়ে বিস্তৃত গুমাই বিলের শুরুতে আয়তন ছিল ৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি। বর্তমানে তা কমে ৩ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।


বাইনালার ছড়া, সোনাইছড়ি, মুন্দরী, কুরমাই, ইছামতি, বারঘোনিয়া, ঘাগড়া হ্রদ খাল ও গুট্টাকার খালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় কৃষি বিভাগ এখানকার সেচব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করেছে।


ইরি, বোরো ও আমন—তিন মৌসুমেই এখানে বিপুল উৎপাদন হয়ে থাকে। দেশের খাদ্যচাহিদা মেটাতে গুমাই বিলে উৎপাদিত ধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

দখল–ভরাটের থাবা : সংকুচিত হচ্ছে গুমাই বিল

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরিয়মনগর থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান পর্যন্ত কাপ্তাই সড়কের দুই পাশে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, দোকানঘর, বাণিজ্যিক গুদাম ও শিল্প স্থাপনা। পাশাপাশি বিলে গড়ে উঠেছে একাধিক ইটভাটা, যা পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।


ইটভাটার ধোঁয়া ও কালো ধুলো কৃষিজমির মাটির উর্বরতা কমাচ্ছে—এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন কৃষকেরা।


চন্দ্রঘোনার আধুরপাড়া গ্রামের কৃষক মমতাজ মিয়া বলেন—

“গুমাই বিলে শত শত কৃষকের জমি রয়েছে। অথচ প্রতিনিয়ত জমির পরিমাণ কমছে। বিত্তবানরা কৃষিজমি কিনে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছেন। এর ফলে আমাদের চাষাবাদে বাধা তৈরি হচ্ছে।”


কৃষকদের অভিযোগ, দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি না থাকায় তারা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে বিলের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে।



ধান উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতি


উপজেলা কৃষি অফিসার ইমরুল কায়েস জানান—

“এই বছর গুমাই বিলে ৩৪০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। স্বল্প মেয়াদি ব্রি ধান–৮২ এখানকার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।”


তিনি আরও বলেন—

“জমির আয়তন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন সমস্যা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এটি স্থানীয় খাদ্য সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে।”


কৃষিবিদদের মতে, উৎপাদন কমে গেলে এলাকার বাজারে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের কেনাকাটায় চাপ সৃষ্টি করবে।


সচেতন মহলের আশঙ্কা : থামছে না দখল–ভরাট


স্থানীয় নাগরিক সমাজ, পরিবেশকর্মী ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—


অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা নির্মাণ,কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন,কৃষিজমি ভরাট,ইটভাটার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধ না করলে গুমাই বিল পুরোপুরি বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ,দখল বন্ধে নিয়মিত মনিটরিং,পরিবেশবিধি অনুসরণে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ,কৃষিজমি রক্ষায় বিশেষ অঞ্চলের ঘোষণা দরকার।

পরিবেশকর্মীদের ভাষায়—“গুমাই বিল বাঁচলে রাঙ্গুনিয়া বাঁচবে।”


আপনার মতামত লিখুন

খোলা বার্তা

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


শস্যসম্ভারে গুমাই বিলের নবজাগরণ

প্রকাশের তারিখ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

রাঙ্গুনিয়ার কৃষি–অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত গুমাই বিল আজ দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনার চাপে দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

 একসময় যে বিল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেই বিলের জমি আজ ভূমিদস্যুদের দখল ও ইটভাটার বিকাশে ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। স্থানীয় কৃষক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহল—সকলেই সতর্ক করছেন, এখনই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নিলে গুমাই বিলে উৎপাদনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।




ঐতিহ্যের ইতিহাস : ঝিল থেকে শস্যভাণ্ডার


ঐতিহাসিকভাবে গুমাই এলাকা ছিল এক বিশাল প্রাকৃতিক ঝিল। প্রচুর প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত বলে এটি স্থানীয়দের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল। ১৯৪৫ সালে স্থানীয় কৃষিপ্রেমী আবদুল বারী তালুকদার ঝিলটি সংস্কার করে আধুনিক কৃষিকাজ আরম্ভ করেন। তার উদ্যোগে ঝিলটি বিস্তৃত কৃষিজমিতে রূপ নিয়ে গুমাই বিলে পরিণত হয়। পাকিস্তান আমলে ধান চাষ শুরু হলেও স্বাধীনতার পর সেচব্যবস্থার উন্নয়নে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।


সময়ের ধারায় গুমাই বিল হয়ে ওঠে রাঙ্গুনিয়ার “শস্যভাণ্ডার” এবং স্থানীয় কৃষকের প্রধান ভরসাস্থল।



বিলে বিস্তৃতি ও উৎপাদন সক্ষমতা


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা, মরিয়মনগর, হোসনাবাদ, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া, লালানগরসহ পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডজুড়ে বিস্তৃত গুমাই বিলের শুরুতে আয়তন ছিল ৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি। বর্তমানে তা কমে ৩ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।


বাইনালার ছড়া, সোনাইছড়ি, মুন্দরী, কুরমাই, ইছামতি, বারঘোনিয়া, ঘাগড়া হ্রদ খাল ও গুট্টাকার খালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় কৃষি বিভাগ এখানকার সেচব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করেছে।


ইরি, বোরো ও আমন—তিন মৌসুমেই এখানে বিপুল উৎপাদন হয়ে থাকে। দেশের খাদ্যচাহিদা মেটাতে গুমাই বিলে উৎপাদিত ধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

দখল–ভরাটের থাবা : সংকুচিত হচ্ছে গুমাই বিল

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরিয়মনগর থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান পর্যন্ত কাপ্তাই সড়কের দুই পাশে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, দোকানঘর, বাণিজ্যিক গুদাম ও শিল্প স্থাপনা। পাশাপাশি বিলে গড়ে উঠেছে একাধিক ইটভাটা, যা পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।


ইটভাটার ধোঁয়া ও কালো ধুলো কৃষিজমির মাটির উর্বরতা কমাচ্ছে—এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন কৃষকেরা।


চন্দ্রঘোনার আধুরপাড়া গ্রামের কৃষক মমতাজ মিয়া বলেন—

“গুমাই বিলে শত শত কৃষকের জমি রয়েছে। অথচ প্রতিনিয়ত জমির পরিমাণ কমছে। বিত্তবানরা কৃষিজমি কিনে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছেন। এর ফলে আমাদের চাষাবাদে বাধা তৈরি হচ্ছে।”


কৃষকদের অভিযোগ, দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি না থাকায় তারা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে বিলের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহও ব্যাহত হচ্ছে।



ধান উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতি


উপজেলা কৃষি অফিসার ইমরুল কায়েস জানান—

“এই বছর গুমাই বিলে ৩৪০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। স্বল্প মেয়াদি ব্রি ধান–৮২ এখানকার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।”


তিনি আরও বলেন—

“জমির আয়তন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন সমস্যা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এটি স্থানীয় খাদ্য সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে।”


কৃষিবিদদের মতে, উৎপাদন কমে গেলে এলাকার বাজারে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের কেনাকাটায় চাপ সৃষ্টি করবে।


সচেতন মহলের আশঙ্কা : থামছে না দখল–ভরাট


স্থানীয় নাগরিক সমাজ, পরিবেশকর্মী ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—


অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা নির্মাণ,কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন,কৃষিজমি ভরাট,ইটভাটার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধ না করলে গুমাই বিল পুরোপুরি বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ,দখল বন্ধে নিয়মিত মনিটরিং,পরিবেশবিধি অনুসরণে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ,কৃষিজমি রক্ষায় বিশেষ অঞ্চলের ঘোষণা দরকার।

পরিবেশকর্মীদের ভাষায়—“গুমাই বিল বাঁচলে রাঙ্গুনিয়া বাঁচবে।”



খোলা বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. ছাইদুল ইসলাম (আবির)
✆ ০১৭৫০-৭০৭৬৩৬
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক : মো. একরামুল হক।
✆ ০১৯২৮-৩১৩১২০
ই মেইল: kholabartaonline@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ খোলা বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত