সকাল থেকে শরতের আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ। দুপুর গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সুনীল আকাশ ঢেকে আসে কালো মেঘে। কিছুক্ষণ পর নামে ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিকে সঙ্গী করেই সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসবে মেতে ওঠেন মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় আচার, গান, নাচ আর ঢোল-মাদলের তালে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রাম।
বুধবার বৃষ্টিস্নাত দুপুর থেকে উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামের মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার পাঠশালা চত্বরে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। বাবা ও ভাইদের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এ কারাম পরব।
ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশীতে সাধারণত এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কারাম উৎসবকে ঘিরে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মাহাতোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষও এতে অংশ নেন। বৃষ্টির কারণে পথে কাদা হলেও উৎসবে যোগ দিতে অনেকে কাদাপানি মাড়িয়ে গ্রামে আসেন।
উৎসবে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, কারাম পরব মাহাতো জনজাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাই-বোনের সৌহার্দ্য, পারিবারিক মঙ্গল ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার বার্তা বহন করে এ উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক চর্চাও টিকে থাকুক—এমন প্রত্যাশা তাদের।
বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের সংগ্রাহক মাহবুবুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক বছর আগে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামে বিপন্ন কারামগাছ প্রথমবারের মতো রোপণ করা হয়। কারামগাছ হলদু নামেও পরিচিত। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এ গাছ সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কারামগাছের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবও আরও সমৃদ্ধ হোক—এটাই প্রত্যাশা তাঁর।
মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, ‘কারাম পরব সমতলের জাতিগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব। মূল শব্দ করম হলেও বর্তমানে কারাম নামেই এটি বেশি পরিচিত।’ তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মরিশাস ও ফিজিসহ বিভিন্ন দেশে এ উৎসব পালিত হয়।
কুড়মালি ভাষায় প্রচলিত একটি গানে বলা হয়, ‘গিঁইরালাই ভাদারআ মাসঅ, লাগালাই কারাম কেএ আঁস’—অর্থাৎ ভাদ্র মাস এসেছে, মনে কারাম পরবের আশা জেগেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ উৎসব পালিত হয়।
সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, বড়াইক, কুর্মি, সিং, পাহান, মাহালি ও বেদিয়াসহ বিভিন্ন জাতিসত্তা নিজস্ব রীতিতে কারাম পরব পালন করে। মাহাতোদের কুড়মালি ভাষায় এ উৎসব নিয়ে ২০১৩ সালে উজ্জ্বল কুমার মাহাতোর লেখা ‘কারাম’ নামের একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়।
কারামগাছের ডাল কেটে প্রাচীন নানা রীতি অনুসরণ করে এ উৎসব পালন করা হয়। এ কারণে এর নাম কারাম পরব। কোথাও কোথাও করমের ডাল গেড়ে পূজা করার কারণে এটি ‘ডাল পূজা’ নামেও পরিচিত।
কারাম পরবে কেরমেতিরা বাবা ও ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করেন। পাশাপাশি বৃক্ষ ও প্রকৃতির বন্দনাও করা হয়। কৃষি ও বৃক্ষের সঙ্গে জাতিগোষ্ঠীগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারামগাছ বা করমগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Haldina cordifolia।
কারাম পরবের আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত পাঁচ দিন ধরে চলে। কোথাও কোথাও সাত দিনও এ আয়োজন করা হয়। প্রথম দিন থেকেই পূজায় অংশ নেওয়া কেরমেতিদের আমিষ খাবার, হলুদ, তেল ও বিভিন্ন মসলাজাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়।
উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘জাওয়া’। মাটি, বালু, মুগ, কুর্থি, ছোলা প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য ডালা তৈরি করা হয়। নিয়মিত পানি দেওয়া ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক দিনে বীজ থেকে দুই পাতাবিশিষ্ট সবুজ চারা গজায়। এর মধ্য দিয়ে বীজ থেকে চারা তৈরি, লালন-পালন ও সংরক্ষণের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে।
বিভিন্ন আচার, গান ও ঝুমুরের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন রাতে জাওয়া তোলা, পানি দেওয়া ও জাগানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। শেষ দিনে সন্ধ্যায় উঠানে করমের ডাল গেড়ে শাপলা ফুল, শসা, ফিতা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়। ডালের গোড়ায় রাখা হয় জাওয়ার ডালা। জ্বালানো হয় প্রদীপ। এরপর ধর্মীয় বিশ্বাস ও নানা আচার পালনের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়।
উৎসবের রাতে কারামকে ঘিরে চলে গান ও নাচ। ঢোল, মাদলসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে ঝুমুর ও গীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পল্লি। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী ও বয়স্কদের অংশগ্রহণে প্রদীপের আলো এবং ঢোল-মাদলের শব্দে রঙিন হয়ে ওঠে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামের রাত।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সকাল থেকে শরতের আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ। দুপুর গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সুনীল আকাশ ঢেকে আসে কালো মেঘে। কিছুক্ষণ পর নামে ঝুম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিকে সঙ্গী করেই সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসবে মেতে ওঠেন মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় আচার, গান, নাচ আর ঢোল-মাদলের তালে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রাম।
বুধবার বৃষ্টিস্নাত দুপুর থেকে উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামের মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার পাঠশালা চত্বরে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। বাবা ও ভাইদের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এ কারাম পরব।
ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশীতে সাধারণত এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কারাম উৎসবকে ঘিরে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মাহাতোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষও এতে অংশ নেন। বৃষ্টির কারণে পথে কাদা হলেও উৎসবে যোগ দিতে অনেকে কাদাপানি মাড়িয়ে গ্রামে আসেন।
উৎসবে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, কারাম পরব মাহাতো জনজাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাই-বোনের সৌহার্দ্য, পারিবারিক মঙ্গল ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার বার্তা বহন করে এ উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক চর্চাও টিকে থাকুক—এমন প্রত্যাশা তাদের।
বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের সংগ্রাহক মাহবুবুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক বছর আগে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামে বিপন্ন কারামগাছ প্রথমবারের মতো রোপণ করা হয়। কারামগাছ হলদু নামেও পরিচিত। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এ গাছ সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কারামগাছের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবও আরও সমৃদ্ধ হোক—এটাই প্রত্যাশা তাঁর।
মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, ‘কারাম পরব সমতলের জাতিগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব। মূল শব্দ করম হলেও বর্তমানে কারাম নামেই এটি বেশি পরিচিত।’ তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মরিশাস ও ফিজিসহ বিভিন্ন দেশে এ উৎসব পালিত হয়।
কুড়মালি ভাষায় প্রচলিত একটি গানে বলা হয়, ‘গিঁইরালাই ভাদারআ মাসঅ, লাগালাই কারাম কেএ আঁস’—অর্থাৎ ভাদ্র মাস এসেছে, মনে কারাম পরবের আশা জেগেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ উৎসব পালিত হয়।
সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, বড়াইক, কুর্মি, সিং, পাহান, মাহালি ও বেদিয়াসহ বিভিন্ন জাতিসত্তা নিজস্ব রীতিতে কারাম পরব পালন করে। মাহাতোদের কুড়মালি ভাষায় এ উৎসব নিয়ে ২০১৩ সালে উজ্জ্বল কুমার মাহাতোর লেখা ‘কারাম’ নামের একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়।
কারামগাছের ডাল কেটে প্রাচীন নানা রীতি অনুসরণ করে এ উৎসব পালন করা হয়। এ কারণে এর নাম কারাম পরব। কোথাও কোথাও করমের ডাল গেড়ে পূজা করার কারণে এটি ‘ডাল পূজা’ নামেও পরিচিত।
কারাম পরবে কেরমেতিরা বাবা ও ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করেন। পাশাপাশি বৃক্ষ ও প্রকৃতির বন্দনাও করা হয়। কৃষি ও বৃক্ষের সঙ্গে জাতিগোষ্ঠীগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারামগাছ বা করমগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Haldina cordifolia।
কারাম পরবের আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত পাঁচ দিন ধরে চলে। কোথাও কোথাও সাত দিনও এ আয়োজন করা হয়। প্রথম দিন থেকেই পূজায় অংশ নেওয়া কেরমেতিদের আমিষ খাবার, হলুদ, তেল ও বিভিন্ন মসলাজাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়।
উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘জাওয়া’। মাটি, বালু, মুগ, কুর্থি, ছোলা প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য ডালা তৈরি করা হয়। নিয়মিত পানি দেওয়া ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক দিনে বীজ থেকে দুই পাতাবিশিষ্ট সবুজ চারা গজায়। এর মধ্য দিয়ে বীজ থেকে চারা তৈরি, লালন-পালন ও সংরক্ষণের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে।
বিভিন্ন আচার, গান ও ঝুমুরের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন রাতে জাওয়া তোলা, পানি দেওয়া ও জাগানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। শেষ দিনে সন্ধ্যায় উঠানে করমের ডাল গেড়ে শাপলা ফুল, শসা, ফিতা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়। ডালের গোড়ায় রাখা হয় জাওয়ার ডালা। জ্বালানো হয় প্রদীপ। এরপর ধর্মীয় বিশ্বাস ও নানা আচার পালনের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়।
উৎসবের রাতে কারামকে ঘিরে চলে গান ও নাচ। ঢোল, মাদলসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে ঝুমুর ও গীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পল্লি। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-যুবতী ও বয়স্কদের অংশগ্রহণে প্রদীপের আলো এবং ঢোল-মাদলের শব্দে রঙিন হয়ে ওঠে পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামের রাত।

আপনার মতামত লিখুন