ঢাকা    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
খোলা বার্তা

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, ৪.২১ জিপিএ নিয়ে স্বপ্নপূরণ শেফালী বেগমের



৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, ৪.২১ জিপিএ নিয়ে স্বপ্নপূরণ শেফালী বেগমের
৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, ৪.২১ জিপিএ নিয়ে স্বপ্নপূরণ শেফালী বেগমের


নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগমের বয়স এখন ৫২ বছর। সংসারের দায়িত্ব ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতায় একসময় থেমে গিয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। তবে মনের ভেতর লালন করা পড়াশোনার স্বপ্ন বিসর্জন দেননি তিনি। দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবারও বই হাতে তুলে নিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জন করেছেন। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি এলাকায়ও আনন্দ ও প্রশংসার সৃষ্টি হয়েছে।

শেফালী বেগম গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিনের বিরতি কাটিয়ে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেন।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন শেফালী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রাখতেন তিনি। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক প্রতিকূলতায় তাঁর শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ে। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তানদের লালন-পালন ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়।

তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কখনো হারিয়ে ফেলেননি তিনি। একপর্যায়ে স্বামী ও তিন সন্তানের অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। বয়সের ব্যবধান, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি ও সংসারের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে শুরু করেন নতুন করে পথচলা। অবশেষে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জনের মধ্য দিয়ে পূরণ করেন দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।

মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ছেলে আব্দুর রাজ শাফি। তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই অর্জন আমাদের পরিবারের জন্য ঐতিহাসিক একটি মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি। আমরা চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুন।”

শেফালীর মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই অর্জন শুধু আমাদের পরিবারের জন্য আনন্দের নয়, সমাজের নারী ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।”

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব বেশি দেখিনি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে বয়স নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড়। তাঁর এই সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করবে।”

নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেফালী বেগম। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, “পরিবারের জন্য শেফালী নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর সে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই অর্জনে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।”

দাদির সাফল্যে আনন্দিত নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ। সে বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি খুব খুশি ও গর্বিত। দাদির সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি ডাক্তার হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”

শেফালী বেগমের এই অর্জন কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা নানা কারণে যাঁদের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে গেছে, তাঁদের জন্য তাঁর এই সাফল্য হতে পারে নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা।

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জনের মধ্য দিয়ে শেফালী বেগম আবারও প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। প্রবল ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

খোলা বার্তা

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, ৪.২১ জিপিএ নিয়ে স্বপ্নপূরণ শেফালী বেগমের

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image


নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগমের বয়স এখন ৫২ বছর। সংসারের দায়িত্ব ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতায় একসময় থেমে গিয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। তবে মনের ভেতর লালন করা পড়াশোনার স্বপ্ন বিসর্জন দেননি তিনি। দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবারও বই হাতে তুলে নিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জন করেছেন। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি এলাকায়ও আনন্দ ও প্রশংসার সৃষ্টি হয়েছে।

শেফালী বেগম গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিনের বিরতি কাটিয়ে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেন।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন শেফালী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রাখতেন তিনি। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক প্রতিকূলতায় তাঁর শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ে। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তানদের লালন-পালন ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়।

তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কখনো হারিয়ে ফেলেননি তিনি। একপর্যায়ে স্বামী ও তিন সন্তানের অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। বয়সের ব্যবধান, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি ও সংসারের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে শুরু করেন নতুন করে পথচলা। অবশেষে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জনের মধ্য দিয়ে পূরণ করেন দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।

মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ছেলে আব্দুর রাজ শাফি। তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই অর্জন আমাদের পরিবারের জন্য ঐতিহাসিক একটি মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছি। আমরা চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করুন।”

শেফালীর মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই অর্জন শুধু আমাদের পরিবারের জন্য আনন্দের নয়, সমাজের নারী ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।”

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব বেশি দেখিনি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে বয়স নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড়। তাঁর এই সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করবে।”

নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেফালী বেগম। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, “পরিবারের জন্য শেফালী নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর সে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই অর্জনে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।”

দাদির সাফল্যে আনন্দিত নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ। সে বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি খুব খুশি ও গর্বিত। দাদির সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি ডাক্তার হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”

শেফালী বেগমের এই অর্জন কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা নানা কারণে যাঁদের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে গেছে, তাঁদের জন্য তাঁর এই সাফল্য হতে পারে নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা।

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.২১ জিপিএ অর্জনের মধ্য দিয়ে শেফালী বেগম আবারও প্রমাণ করেছেন, শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। প্রবল ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।


খোলা বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. ছাইদুল ইসলাম (আবির)
✆ ০১৭৫০-৭০৭৬৩৬
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক : মো. একরামুল হক।
✆ ০১৯২৮-৩১৩১২০
ই মেইল: kholabartaonline@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ খোলা বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত